Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

মঙ্গলবার, ১ এপ্রিল, ২০২৫

ভারতেরই এই অঞ্চলে বিচারসভা বসিয়ে ঈশ্বরকে শাস্তি ‌দেন নশ্বর ভক্তেরা

 ‌

Punishment-to-God

সমকালীন প্রতিবেদন : বিচারসভা বসিয়ে ঈশ্বরকে দেওয়া হয় কঠিন শাস্তি! ভগবানের বিচার করেন নশ্বর ভক্তেরা! অদ্ভুত কান্ড ঘটে আমাদের এই দেশে। জায়গাটা কোথায়? কেমন শাস্তি দেওয়া হয় ভগবানকে? কিভাবেই বা দেওয়া হয়? জানেন, এই জনতার আদালত কতটা সাংঘাতিক? ঘোর বর্ষায় ঘটে এই রহস্যময় ঘটনা। আজকের এই প্রতিবেদনে ঈশ্বরকে শাস্তি দেওয়ার এই অদ্ভুত প্রথা নিয়ে থাকবে বিস্তারিত।

ভারতবর্ষের এই জায়গায় জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই উপজাতি। এঁদের লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি পৌরাণিক এবং লোককাহিনি নির্ভর। গোন্দ, মারিয়া, ভাতরা, হালবা এবং ধুরওয়া উপজাতিরা শতাব্দীপ্রাচীন নানা ঐতিহ্যের চর্চা করেন, যা এই অঞ্চলের বাইরে শোনা যায় না। এমনকি শুনলে অবাকও হতে হয়। তেমনই বিভিন্ন প্রথার মধ্যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এই ‘ঈশ্বরের শাস্তি’। 

প্রতি বছর বর্ষাকালে স্থানীয় ভাঙারামদেবী মন্দির চত্বরে বসে জনতার আদালত। ওই সময়ে তিন দিন ধরে হয় ‘ভাদো যাত্রা।’ সেখানেই চলে দেবতার বিচার। কিন্তু বিচারক কে? তিনদিনের এই বিচার পর্বে অভিযুক্ত দেবদেবীর বিচারকের ভূমিকায় দেখা যায় ভাঙারামদেবীকে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, বহু শতাব্দী আগে বর্তমান তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গল থেকে ভাঙারামদেবী ছত্তীসগঢ়ের বস্তারে পৌঁছান। 

ভাঙারামদেবীর নেতৃত্বে শুরু হয় বিচারসভা। সেখানে বিচার হয় মন্দিরের ভিতরে থাকা দেবদেবীদের। আর জনজাতি গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব সেখানে উকিল বা আইনজীবীর ভূমিকায় থাকেন। বিভিন্ন পশুপাখি, বিশেষত মুরগিকে সাক্ষী হিসাবে হাজির করানো হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ হয়ে গেলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। 

এদিকে বিচারকের সামনে স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে হাজির হন। তাঁদের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবীরা। কিন্তু বস্তারের এই অদ্ভুত প্রথায় কোন কোন দোষের শাস্তি পান ঈশ্বর? ঠিক মতো ফলন না হওয়া, কোনও রোগের প্রাদুর্ভাব রুখতে না পারা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলাতে না পারা কিংবা ভক্তদের মানতে সাড়া না দেওয়া, এই সব নিয়েই চলে বিচার পর্ব।

দেবতার অপরাধের গুরুত্ব বিচার করে শাস্তির পরিমাণ ধার্য করেন গ্রামবাসীরাই। যেমন কিছুদিনের জন্য কারাবাস, মন্দির থেকে নির্বাসন বা চির নির্বাসনের মতো কঠিন শাস্তি ভোগ করেন দেবতারা। নির্বাসিত দেবতারা ‘ক্ষমা’ চাইলে এবং ভাঙারামদেবীকে ‘রাজি’ করাতে পারলে, তাঁদের নির্বাসন স্থগিত করা হয়। যদি তাঁরা তাঁদের আচরণ সংশোধন করতে পারেন, তবেই মন্দিরে ফিরতে পারেন।

কিন্তু দেবতারা আসেন কোথা থেকে? কিভাবে ভোগ করেন তাঁরা শাস্তি? কারাদণ্ডের শাস্তিস্বরূপ একটা বড় গাছের তলায় বসিয়ে রাখা হয় কাঠের তৈরি মূর্তিরূপী দেবতাদের। যাঁরা ‘টোটেম’ নামেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিচিত। আর যাঁদের নির্বাসনে পাঠানো হয়, তাঁদের মন্দিরের পিছনে একটা জায়গায় রেখে আসা হয়।

কিন্তু এখানে একটা অদ্ভুত বিষয় আছে। নির্বাসিত দেবতাদের সমস্ত পোশাক পরিচ্ছদ, অলঙ্কার সহ রেখে আসা হয় মন্দিরের পিছনের ফাঁকা চত্বরে। অথচ স্থানীয়দের দাবি, শাস্তিপ্রাপ্ত কোনও দেবদেবীর মূর্তি থেকে একটাও গয়না কখনও চুরি হয়নি। আসলে, এর পেছনেও কারণ রয়েছে। জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিশ্বাস করেন, দেবতার গয়না কেউ চুরি করলে তাঁর উপরও দেবদেবীর শাস্তির খাঁড়া নেমে আসবে।

এই অদ্ভুত বিচার পর্ব দেখতে ভিড় জমান বহু গ্রামের মানুষ। রান্নাবান্না থেকে পেটপুজো, আয়োজন থাকে সবকিছুর। এই ঈশ্বরের শাস্তি নিয়ে যা কিছু হয়, সেই বিষয়ে স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, এটা একটা সামাজিক ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থায় বস্তারের মানুষ বিশ্বাস করেন ঈশ্বর যেমন মানুষের কর্মফল বিচার করেন, তেমনই ঈশ্বরের বিচারও মানুষ করতে পারেন। তিনিও বিচারের ঊর্ধ্বে নন।‌

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন